Sale!

গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা

৳ 180.00

SKU: 35178931 Category:

Description

গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা

লেখক: আব্দুস সালাম আল আশরী
অনুবাদক: মাওলানা ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী
প্রকাশনী: রাহনুমা প্রকাশনী

কাফেলা কাছাকাছি চলে এসেছে। সারা মক্কা জেগে উঠলো কাফেলাকে স্বাগত জানাতে। অনেক চিন্তার ভিড়ে শাম থেকে আসা নতুন পণ্য এবং আগামী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে খাদিজা ভাবনা শুরু করে দিলেন। এর মাঝেই ঘোষক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রচার করলো মক্কায়—আশা করা হচ্ছে, রাত পোহালেই শামের কাফেলা মক্কায় পৌঁছে যাবে!
সবাই গুদামঘর ঠিকঠাক করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো। পণ্যশালায় ভিড় বাড়তে লাগলো। শুরু হলো আলোচনা—লাভ-ক্ষতির। ইয়েমেনী পণ্যে কী পরিমাণ লাভ হতে পারে কিংবা ক্ষতি, সে হিসাবও মুখে মুখে ঘুরতে লাগলো। সিরিয়া থেকে বয়ে আনা পণ্যের চাহিদা ও বাজারমূল্য ঠিক আছে তো?
* * *
পরদিন ভোরে মক্কার দৃশ্য বদলে গেলো। সবাই ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে উঠলো। কাফেলাকে স্বাগত জানাতে মক্কার উপকণ্ঠে এসে বসে রইলো। অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। এ অপেক্ষায় যোগ হলো কতো মানুষ! যোগ দিলো অসহায় দরিদ্ররাও, যারা বাণিজ্য-কাফেলা ফিরে এলে কিছু না-কিছু পেয়েই যায়। কোলাহল শুরু হয়ে গেলো কুলি ও বোঝাবহনকারীদের মাঝেও, এদেরও এখন কিছু পাওয়ার সময়। অপরদিকে উৎকণ্ঠাভরে অপেক্ষা করছেন একদল মা, যাদের সন্তানেরা গিয়েছিলো এ কাফেলায়, শ্রম দিতে, মজুরির বিনিময়ে! সবাই ফিরে এসেছো তো! কোনো বিপদ হয় নি তো! এসব নীরব জিজ্ঞাসাই ভেসে বেড়াচ্ছিলো তাদের চোখে-মুখে।
এ দলে দাঁড়িয়ে আছে আরেকদল উদ্বেগাক্রান্ত স্ত্রীও, যারা এখনো জানে না, তাদের স্বামীরা কি সবাই ফিরে এসেছে? নাকি কুদরতের অমোঘ বিধানে কেউ কেউ হারিয়ে গেছে—চলে গেছে না-ফেরার দেশে!
সবার মতো খাদিজাও নিজের পণ্যসম্ভার গ্রহণ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। আগের মতোই তার আঙিনায় অনেক প্রার্থী। দীন-দুঃখী-অসহায়দের ভিড়। খাদিজার বাঁদিরাও প্রাণবন্ত হয়ে ছুটোছুটি শুরু করে দিলো। পরস্পরে বলাবলি করতে লাগলো মালিকানপ্রদত্ত প্রতিশ্রুতির কথা। ওদের চোখ হাসছিলো। ওদের মুখ হাসছিলো। ওদের আশা— কাফেলা অনেক লাভবান হয়ে ফিরে আসছে। কাফেলা যতো লাভবান ওদের পুরষ্কার ততো ফলবান।
জোহরের পর, আসরের একটু আগে। খাদিজা ভবনের দোতলায় দাঁড়িয়ে আছেন। অপেক্ষা করছেন অধীরচিত্তে। পথের দিকে তাকিয়ে আছেন অনিমেষ (অপলক) চোখে। তাঁকে বেষ্টন করে থাকা বাঁদিরা তাকিয়ে আছে তীক্ষè দৃষ্টিতে, মালিকানকে সুসংবাদ জানাতে মরিয়া হয়ে। অবশেষে কাফেলা দেখা গেলো, দূর-দিগন্তে। এগিয়ে আসছে মক্কার দিকে। খাদিজা অনুভব করলেন যতো না আনন্দ তারচেয়ে বেশি হৃদয়ের ক্রমবর্ধমান ধুকধুকানি। তিনি যতোটা সম্ভব দৃষ্টি মেলে তাকালেন। হ্যাঁ, এই তো উটগুলো আস্তে আস্তে বড় হয়ে আসছে! কাফেলা ধীরে ধীরে অবয়ব ফিরে পাচ্ছে! হঠাৎ এক বাঁদি সোল্লাসে চিৎকার করে উঠলো :
-মালিকান! মুহাম্মদ, ওই-যে আল-আমীন! পাশে মায়সারা!!
মুহাম্মদ ছিলেন তাঁর উটে, পাশেই মায়সারা আরেকটি উটে। পেছনেই পণ্যবাহী উটের সারি। তখন ঠিক তখনই খাদিজা দেখলেন এক বিস্ময়কর দৃশ্য! খাদিজা লক্ষ করলেন, কাফেলার সবাই পুড়ছে রৌদ্রে আর মুহাম্মদ চলছে একখ- মেঘছায়া মাথায় নিয়ে!! এমনকি তাঁর পাশের মায়সারাও রোদে জ্বলছে!! খাদিজা কি ভুল দেখছেন? এমনই তো দৃশ্যটা! মুহাম্মদ একা মেঘের ছায়ায়! বাকি সবাই রোদের ঘেরায়!! খাদিজা দেখলেন হঠাৎ এক বাঁদি চিৎকার করে বলছে :
-মালিকান! লক্ষ করেছেন? কী বিস্ময়কর দৃশ্য? মুহাম্মদের উপর রোদ নেই, সবার উপর রোদ?! মালিকান! মুহাম্মদ যেখানে ছায়াটাও সেখানে! এমনকি মুহাম্মদ নিচু হলে মেঘখ-টাও নিচে নেমে আসছে! আয় আল্লাহ!!
ঘোরলাগা দৃষ্টিতে বিস্ময়-বিমুগ্ধ খাদিজা বাঁদির কথায় নিজের পর্যবেক্ষণের উপর আস্থা ফিরে পেলেও নীরব রইলেন, কোনো উত্তর করলেন না। তিনি কাফেলার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়েই রইলেন।
কাফেলা এসে থামলো। উটের দল বসতে লাগলো। লোকেরা ছুটোছুটি শুরু করে দিলো। ছেলে ছুটে গেলো বাবার দিকে। বাবা ছুটে গেলো ছেলের দিকে। কেউ-বা ভাইয়ের দিকে। শুরু হলো খোঁজ-খবর। স্বাগতিকরা জানতে চাচ্ছে, কে এলো আর কে এলো না। সফরের সময়টা কেমন কাটলো … ইত্যাদি।
* * *
মায়সারা মুহাম্মদকে অনুরোধ করলো আগে গিয়ে খাদিজাকে সব জানাতে। মুহাম্মদ এগিয়ে আসছেন মহলের দিকে দেখেই খাদিজা নিচে নেমে এলেন— তাঁকে স্বাগত জানাতে।
এসেই দেখলেন বিস্ময়, মহাবিস্ময়! ঠিক স্বপ্নে দেখা সুর্যের মতোই মুহাম্মদ! চেহারা থেকে সূর্যালোকের মতো প্রখর জ্যোতি বের হচ্ছে! মহল আলোকিত হয়ে উঠেছে! আশপাশও! মক্কাও! চারদিকে কেবলই আলো আর আলো! বিস্মিত বিমুগ্ধ খাদিজা মুহাম্মদকে স্বাগত জানালেন। মুহাম্মদও প্রতিউত্তর করলেন। তারপর খাদিজাকে সবিস্তারে সফরের সব জানালেন। তারপর বিদায় নিয়ে চলে গেলেন! বাড়িতে গিয়ে মিলিত হলেন চাচাজান আবু তালিবসহ অন্যান্য চাচাদের সাথে। আলাপ হলো আত্মীয়দের সাথে .. স্নেহভাজনদের সাথে।
এদিকে বিস্ময়-বিমুগ্ধ খাদিজা ছুটে গেলেন নতুন পণ্য দেখতে, পর্যবেক্ষণ করতে ব্যবসায়িক মালামাল। অনেক পণ্য! অনেক মাল! সব দেখে খাদিজা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, এতো লাভ কী করে হলো, কেমন করে মুহাম্মদ এতো মাল নিয়ে এলেন! কোথায় পেলেন মূল্য? বিপুল পণ্যের বৈচিত্র-বৈভবে খাদিজা অবাক বিস্মিত! ডেকে পাঠালেন মায়সারাকে! মায়সারা আসতেই খাদিজা আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন :
-মায়সারা! কী করে এসেছো তোমরা? এতো লাভ কী করে হলো? এতো পণ্য কীভাবে কিনলে?!
মায়সারা সারা মুখে আনন্দ ছড়িয়ে বললো :
-মালিকান! সবই মুহাম্মদের বরকত! আমরা যে-ই-না বুসরার বাজারে ঢুকলাম সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতারা এসে ভিড় করতে লাগলো! এ ভিড় আর কমলো না, ক্ষণে ক্ষণে কেবলই বাড়লো! আমাদের পণ্য যতো কমে ভিড় ততো বাড়ে! আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এ রকম ভিড় আর কোথাও ছিলো না! অথচ আমাদের মতো পণ্য তো সবার কাছেই ছিলো!
মালিকান! আমি ভাবতেই পারি নি, বেচাকেনায় মুহাম্মদ এতোটা দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেবেন! আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বেচাকেনার পর্ব শেষ করে ফেললাম! অন্য ব্যবসায়ীরা অবাক-বিস্ময়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিলো! কেউ কেউ তো বলেই ফেললো :
-মায়সারা! এসব কী ঘটছে?! তোমাদের আর আমাদের পণ্য কি এক নয়? নাকি কৌশলে আমাদের পেছনে ফেলে দিলে! নাকি এখানে পৌঁছার আগেই ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে রেখেছিলে?!
খাদিজা বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বললেন :
-কিন্তু মায়সারা, পণ্য বিক্রির যে মূল্য তা দিয়ে তো এতো পণ্য কিছুতেই কেনা সম্ভব না! এতো সব কেনার মূল্য কোত্থেকে এলো?! আমার তো মনে হয় এ পণ্য কিনতে তোমাদের বিক্রিত পণ্যের মূল্য কেনো, তার দ্বিগুণ-তিনগুণ এমনকি চারগুণও যথেষ্ট নয়!! তাহলে?!
মায়সারার মুখে আবার আগের সেই অনাবিল হাসি! আবার সেই একই উত্তর :
-মুহাম্মদের বরকত!!
এবার খাদিজার বিস্ময় আরও বেড়ে গেলো :
-মানে! কী করে তা হতে পারে?!
-আল্লাহ চাইলে কী না হতে পারে, মালিকান! আমি একটু খুলে বলি— আল্লাহ যেমন মুহাম্মদের সঙ্গে ছিলেন বেচার সময়, অনুরূপ তিনি তাঁর সঙ্গে ছিলেন কেনার সময়ও! অর্থাৎ যে-ই তিনি ক্রেতা হিসাবে বাজারে প্রবেশ করলেন, তাঁর হাতে পণ্য তুলে দেয়ার জন্যে বিক্রেতারা হুড়মুড় করে ছুটে এলো! অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিলো, তারা যেনো বিনামূল্যেই তাঁর হাতে সব তুলে দেবে! মুহাম্মদ মূল্যের ক্ষেত্রে যা-ই প্রস্তাব করছিলেন, তাই তারা মেনে নিচ্ছিলো, কোনো দ্বিরুক্তি করছিলো না! এ অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে অন্যরা তো একেবারে থ হয়ে গেলো! সমস্ত ব্যবসায়ীকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া কী করে সম্ভব হলো? কোন নীতিতে? কোন কৌশলে? কোন দূরদর্শিতায়? তারা এসব নিয়ে বলাবলি করে আর তাকায় মুহাম্মদের নূরানি চেহারার দিকে, তারা চোখ ফেরাতে পারে না, তাকিয়েই থাকে। তাদের কেউ কেউ বিস্ময়ভরে বললো :
-মায়সারা! বিষয় কী! আমাদের বাঘা বাঘা ব্যবসায়ীরা যে কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না! তোমার মুহাম্মদ ‘কোন যাদুবলে’ নিজের পণ্য বিক্রি করলেন বেশি দামে আর অন্যের পণ্য কিনলেন কমদামে—প্রায় বিনামূল্যে?! আগে তো আমরা বলেছি, ক্রেতাদের সাথে তোমাদের পূর্ব-যোগাযোগ ছিলো, এখন তো দেখছি বিক্রেতাদের সাথেও তোমাদের পূর্ব-যোগাযোগ ছিলো!
মায়সারা একটু থামলো। খাদিজার মুখে ফুটে উঠলো একটা অপূর্ব হাসি! ঘোর-লাগা কণ্ঠে তিনি বললেন :
-মায়সারা! আসা-যাওয়ার পথে আর কী কী তোমার দৃষ্টি কাড়লো, বলে যাও! কিছুই বাদ দেবে না, তোমাকে মুহাম্মদের ব্যাপারে বেশ কৌতূহলী হনে হচ্ছে!
মায়সারা হাসিমুখে বললো :
-মালিকান! মুহাম্মদের বিষয়টা ভীষণ আশ্চর্যজনক! আমি এতোক্ষণ আপনাকে যা বলেছি, সে ছিলো বুসরার বাজারের চিত্র। বেচাকেনার চিত্র। সেখানে নানাজন তাঁর সম্পর্কে নানা মন্তব্য করেছে। কেউ কেউ বলেছেন, মুহাম্মদ নিজের দক্ষতাকে সঠিক সময়ে কাজে লাগিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর ভাগ্যও তাঁকে সহযোগিতা করেছে। মালিকান, আমার প্রশ্ন হলো, এটা না হয় মেনে নিলাম যে ভাগ্য তাঁর সুপ্রসন্ন ছিলো। যোগ্যতাও তিনি কাজে লাগাতে পেরেছেন। কিন্তু আকাশের বিষয়টির ব্যাখ্যা কে দেবে? কীভাবে দেবে? মুহাম্মদের ক্রেতা-বিক্রেতাদের বিস্ময়কর অনুকূল আচরণ যদি হয়ে থাকে তার যোগ্যতার স্বর্ণফল, আকাশ কেনো তাঁকে ‘বন্ধু’ বানিয়ে নিলো? কোন সে যোগ্যতার বলে? একটু খুলে বলছি—
আকাশে ছিলো আগুন-ঝরানো সূর্য। মরুবালি যেনো আগুনের অংশ। সূর্যকিরণ যেনো আগুনের ‘ছোট ছোট টুকরো’। আমরা মক্কা থেকে বের হয়েই এ উত্তাপময় সূর্যের কবলে পড়লাম। প্রচ- তাপ থেকে বাঁচতে সবাই পাগড়ি পরে নিচ্ছিলাম, একটার উপরে আরেকটা। পাশাপাশি মাথার উপর ছাতাও মেলে ধরলাম। কিন্তু মুহাম্মদ! আকাশই তাঁর কাছে এগিয়ে এলো! তাঁকে ছায়া দিলো! তাঁর উটকেও ছায়া দিলো! এক খ- মেঘ তাঁর মাথার উপর উড়তে লাগলো! মুহাম্মদ সামনে বাড়ে মেঘখ-ও সামনে বাড়ে! মুহাম্মদ থেমে যায়, সাথে সাথে ওই মেঘখ-ও স্থির নিশ্চল! এ অবস্থা আমি দেখলাম সারা পথেই, একেবারে শামে পৌঁছা পর্যন্ত। মেঘখ-টি রোদে এসে উপস্থিত হয় আর ঘনায়মান সন্ধ্যায় মিলিয়ে যায়! পরদিন সূর্যের উদয়নে আবার তার উদয় ঘটে!

আবেগাপ্লুত মায়সারা একটু থামলো, তাকালো বিস্ময়াভিভূত মালিকানের দিকে! তারপর বিস্ময়কাঁপা কণ্ঠে আবার বলতে লাগলো :
-মেঘ কেনো শুধু মুহাম্মদকেই অমন ছায়া দিচ্ছে— এ নিয়ে কাফেলার লোকজনের কৌতূহলের যেনো শেষ নেই! মাঝে মাঝে তারা এগিয়ে যায় মুহাম্মদের কাছে, সেই ছায়ায় একটু সিক্ত হতে, কিন্তু পারে না, যে-ই তারা কাছে যায় অমনই ছায়াটা সরে পড়ে! আবার যে-ই তারা দূরে চলে যায় ছায়াটা ফিরে আসে!
মুহাম্মদ সারা পথই ছিলেন আত্মসমাহিত। গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। তাঁর কাছে কিছু জানতে চাইলেই কথা বলতেন, নিজে থেকে কোনো কথা বলতেন না। সফরের ক্লান্তি দূর করার জন্যে অন্যান্য মুসাফিরদের মতো কোনো আনন্দ-উচ্ছ্বাসেও তিনি যোগ দিতেন না।
খাদিজা অভিভূত হয়ে মায়সারার কথা শুনেই যাচ্ছিলেন আর কী যেনো ভাবছিলেন। মায়সারাকে জিজ্ঞাসা করলেন :
-শামে মুহাম্মদ কী কী করেছেন? ওখানে কি বিশেষ কিছু ঘটেছে?! শামের পরিবেশ তাঁর কেমন লেগেছে? ওখানে প্রাকৃতিক শোভা-সৌন্দর্য, সবুজ-শ্যামলিমা, সবুজে ছাওয়া বনানী ও উদ্যান এবং ওখানকার কোমল মধুর পরিবেশ তাঁর কেমন লেগেছে?
মায়সারা বললো :
-প্রকৃতির লীলাবৈচিত্র তিনি বেশ উপভোগ করেছেন। শামের সবুজ প্রকৃতি বড়ো উপভোগ করেছেন। গাছ-গাছালি, বন-বনানী, তরতর বয়ে চলা নদী-নালা ঘোরলাগা চোখে দেখেছেন। আমাদের এদিকে তো সবুজের ছোঁয়া নেই। উদ্ভিদের ‘খেলা’ নেই। নদী ও ঝরনার কলকল আওয়াজ নেই। কিন্তু শামে এ সবই আছে। ওখানে আছে উদ্যানের পর উদ্যান। ঘন গাছ-গাছালিরা একে অপরকে যেনো জড়িয়ে রেখেছে। আছে আরও কতো শস্য ও উদ্ভিদ-বৈচিত্র। খেজুর বাগানের সবুজাভ মনকাড়া দৃশ্য থেকে কে চোখ ফেরাতে পারে? ওখানকার বাতাস কী কোমল ও মায়াময়! ওখানকার উষ্ণতাও ভীষণ উপভোগ্য! সবই মুহাম্মদের দৃষ্টি কেড়েছে, মন কেড়েছে। তন্ময়চিত্তে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছেন তিনি শামের প্রকৃতির লীলাবৈচিত্র। আল্লাহর সৃষ্টিলীলায় না জানি ভাবনার কী উপকরণ পেয়েছিলেন তিনি! কেবলই গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন আর নিঃসীম ভাবনায় মোহিত হয়ে যেতেন।
মালিকান! কাফেলার লোকজন যে দিকে মন চাইতো বেরিয়ে যেতো, কিন্তু মুহাম্মদ তাঁবুর বাইরে বসে গভীর দৃষ্টিতে দেখতেন শামের সবুজ প্রকৃতি, মাথার উপরের নীলাকাশ। পর্বতমালার দৃঢ় সৃষ্টিশৈলী। এভাবেই একদিন আমাদের যাত্রার সময় হয়ে গেলো। আমরা সফরের প্রস্তুতি নিলাম। উপযুক্ত সময় দেখে সফর শুরু করলাম।
মায়সারা একটু থামলো। খাদিজা তেমনি ডুবে আছেন চিন্তায়। মুখে লেগে আছে অদ্ভুত মিষ্টি হাসি। খাদিজার দিকে তাকিয়ে মায়সারা বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বরং মুগ্ধতা-ছড়ানো আওয়াজে তার মালিকানকে বললেন :
-জানেন মালিকান! মুহাম্মদ অচিরেই একজন নবী হবেন!! যে নবীর অপেক্ষায় মানুষ প্রহর গোনে চলেছে, অনেক দিন থেকে!! মানুষ তো এখন বলছে সে নবীর আগমনকাল নাকি এখন একদম কাছে!!
এ কথা শুনে খাদিজা নড়েচড়ে উঠলেন! বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন :
-মায়সারা! এ কী বলছো তুমি? এ কথা জানলে কী করে?!
মায়সারা যেনো খাদিজার এ প্রশ্নের উত্তর দিতে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলো! তাই প্রশ্নটা শেষ না হতে হতেই বলতে লাগলো :
-মালিকান! বুসরা নগরীতে গিয়ে আমরা এক জায়গায় অবস্থান নিলাম। মুহাম্মদ কাছেই একটা গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলেন। দেখতে অন্য গাছের মতোই, বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। ওই গাছটির কাছেই বসবাস ছিলো এক পাদরির। থাকতো একটা আশ্রমে। হঠাৎ দেখা গেলো পাদরি আশ্রমের জানালা দিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ওই গাছের নিচে বসা আত্মসমাহিত মুহাম্মদের দিকে! ভাবখানা এমন যেনো সে অতি বিচিত্র একটা দৃশ্য দেখছে! আরও অবাক ব্যাপার হলো পাদরি দ্রুতপদে আমার দিকে ছুটে এলো! এসেই উদ্বেলিত কণ্ঠে জানতে চাইলো :
-ওই-যে গাছটার নিচে বসে আছেন, তাঁর পরিচয়? একটু বলবে আমায়?!!
আমি বললাম :
-তিনি কুরাইশের অভিজাত খানদানের এক যুবক!
এ কথা শুনতেই তিনি চিৎকার করে উঠলেন :
-তিনি কি প্রেরিত হয়েছেন!
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম :
-কী বললেন? ‘প্রেরিত হয়েছেন’ মানে?!
তখন পাদরি আস্থাভরা কণ্ঠে আমাকে বললেন :
-ইনি এখনো প্রেরিত—নবী না হয়ে থাকলে অচিরেই একজন নবী হবেন! আমার জানামতে ওই গাছের নিচে নবী ছাড়া অন্য কেউ বসে নি!!
* * *
মায়সারার কাছে আর কী শুনবেন খাদিজা?
সবই তো শোনা হয়ে গেলো! যা যা শুনতে লালায়িত ছিলেন তিনি, তার কোনটি বাদ পড়েছে?!
খাদিজার চেহারায় বিস্ময় ও আনন্দের আলোকণা একাকার হয়ে আনন্দ-রেণু ছড়াতে লাগলো!
চোখ নীমিলিত করে আবার তিনি সেই স্বপ্নসূর্যটা ভেবে নিলেন!
চাচাতো ভাই ওয়ারাকার ব্যাখ্যাটাও একটু নিবিড়চিত্তে ভেবে নিলেন!
আবার ভেবে নিলেন!
আবার ভেবে নিলেন!
হ্যাঁ, সব ঠিক আছে!
সূর্য মানে—নবী!
আর নবী হবেন তাঁর স্বামী!
মানে এই মুহাম্মদ?! হ্যাঁ .. এই মুহাম্মদই সেই প্রতীক্ষিত নবী!
এই মুহাম্মদই আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা—আমার স্বপ্নের স্বামী!
এই মুহাম্মদ নবী না-হলে আর কে হবেন?!
খাদিজার মনে আনন্দের পাখিরা কলরব করতে লাগলো! মরু-মক্কায় যেনো ঝরনাধারা কলকল করে বয়ে যেতে লাগলো!
* * *
খাদিজা বেরিয়ে এলেন পণ্যশালা থেকে। বাইরের পোশাক পরলেন। ছুটে গেলেন সেই ওয়ারাকার কাছে আবার! গিয়ে সব বললেন তাঁকে, যা যা শুনে এসেছেন একটু আগে মায়সারার মুখে! ওয়ারাকা ঝলমল করে উঠলেন! ওয়ারাকার কণ্ঠটা চিৎকার করে উঠলো :
-খাদিজা! খাদিজা! বলেছিলাম না—মুহাম্মদ সাধারণ কেউ নয়!
খাদিজা বললেন :
-তাহলে কি তিনিই ভবিষ্যতের নবী?!
-আমার তো তা-ই বিশ্বাস! আসমানি কিতাব পড়ে যতোটুকু জেনেছি ও বুঝেছি, তাতে মনে হচ্ছে মুহাম্মদই শেষনবী! এ উম্মতের নবী! তাঁকেই আল্লাহ সবার উপরে ওঠাবেন! মহাসম্মানে ভূষিত করবেন!! আর এ মুহাম্মদই তোমার সেই স্বপ্নসূর্য! এবং তোমার ভবিষ্যৎ স্বামী!!
* * *
খাদিজা ফিরে এলেন গৃহে। সাথে নিয়ে এলেন দৃপ্ত অঙ্গীকার ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
নবুওতের সূর্যকে বরণ করে নিতে এখন তিনি পূর্ণ প্রস্তুত!
আল-আমীনকে ‘হাতছাড়া’ করা যায় না, কিছুতেই না!
আল-আমীন রত্ন! কিন্তু এই রত্ন না, সেই রত্ন—আকাশের রত্ন! সবচেয়ে দামি রত্ন! আমার স্বপ্নসূর্য! আমার ভবিষ্যতের নবী! আমার ভাবী স্বামী!
আল্লাহু আকবার।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা”

Your email address will not be published. Required fields are marked *